Tuesday March 2026

হটলাইন

কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: রবিবার, ৮ এপ্রিল, ২০১৮ এ ১১:৫৭ PM

বিশেষ অর্জন. রূপসা

কন্টেন্ট: পাতা

সাড়ে চার’শ বছর পর রূপসার পিঠাভোগ কুশারী বাড়ীকে স্বীকৃতি দিলো সরকার

সাড়ে চার’শ বছর পরে বাংলাদেশ সরকার প্রায় শিলাইদহর মতো মর্যাদা দিয়ে পিঠাভোগ কে সামনে নিয়ে আসতে চলেছে। ২৫ শে বৈশাখ ৮ ই মে ২০১৬ এই মুহুর্তের কুশারীরা পিরালী দেওয়াল ভেঙ্গে যে রবীন্দ্রনাথকে বরন করতে চলেছেন তিনি কুশারী বা পিরালী কেউ নন। একজন কবি, কেবলই কবি এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

এবার ২৫ বৈশাখে বাংলাদেশ সরকার চলছে পিঠাভোগে। ৩ দিন ধরে চলবে বিশ্ব কবি রবীন্দ্র জন্ম উৎসব। কুড়ি বছর ধরে চেষ্টা চলছে রবীন্দ্রনাথ কে পিঠাভোগের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। স্থানীয় প্রশাসন, সুধীজন ও খুলনা-৪ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য এস.এম. মোস্তফা রশিদী সুজার একক প্রচেষ্টায় গত ২৮ মে ২০১৫ খ্রি: সনে বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে পিঠাভোগে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্বীকৃতি প্রদান করে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ জুন ২০১৫ খ্রি: সনে পিঠাভোগে কবি কে চিরস্থায়ী ভাবে বরন করার জন্য সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে সংরক্ষনের দায়িত্ব নিয়েছে। এর পূর্বে স্থানীয় ও জেলা প্রশাসন একটি আরক্ষ মূর্তির সংগে প্রতিষ্ঠিত করেছেন রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালা ও সংগীত একডেমী। বাংলাদেশ সরকার অবশেষে পিঠাভোগের কুশারী বাড়ীটিকে হেরিটেজ বিল্ডিং এর স্বীকৃতি দিতে চলেছেন। হয়তো সরকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পিরালী, কুশারী ও পিঠাভোগকে তুলে ধরার মানষে কুশারী বাড়ীর অনুরুপ একটি বাড়ী বিখ্যাত আর্কিটেক্সদের সহযোগিতায় নির্মান করবেন।

সেই পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পিঠাভোগের জমিদার জগন্নাথ কুশারী দক্ষিন ডিহির পিরালী ব্রাহ্মন শুকদেব রায় চৌধুরীর কন্যা বা দৌহিত্রীকে বিয়ে করে সমাজচ্যুত হয়েছিলেন। তারপর প্রায় সাড়ে চার’শ বছর এই শাখার আর কেউ ওমুখো হয়নি।

জোড়া সাকো এবং পাথরিয়া ঘাটার ঠাকুর পরিবার এই জগন্নাথ কুশারীর বংশধর। বিস্ময়ের কথা পিঠাভোগ থেকে মাত্র কয়েক মাইল দুরে নরেন্দ্রপুর, দক্ষিনডিহি এবং ফুলতলায় দারকানাথ, দেবেন্দ্রনাথ এবং রবীন্দ্রনাথ তাদের শ্বশুর বাড়ী ও মামা বাড়ীতে একাধিকবার গেলেও কখনও পিঠাভোগে গেছেন তার দালিলিক প্রমান সংরক্ষিত নাই। তবে ঠাকুর পরিবারে সন্তানদের বিবাহ সম্বন্ধ ঠিক করার জন্য পিঠাভোগের কুশারী বাড়ীতে পরিবারের বয়স্করা অবস্থান করেছেন এমনটা লোক মুখে শোনা যায়। আরও জানাযায়, ১৯৩৮ সালে রবীন্দ্রনাথ খুলনায় একটি মামলার স্বাক্ষী দিতে এসেছিলেন, সে সময় তিনি চাকর উমাচরনের কাছে জিজ্ঞাসা করেছিলেন কতদুরে, কিভাবে পিঠাভোগ যাওয়া যায়। তবে নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় অভিমান থেকে জন্ম নেওয়া এক ধরনের অনীহা ই এর কারন।

উপরোক্ত সূত্রে প্রতীয়মান হয় রবীন্দ্রনাথ একদা যেমন নিজেকে পরিচিতি করেছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুরের নাতি বলে, তেমনি হয়তো সঙ্গোপনে নিজেকে পিঠাভোগ গ্রামের জগন্নাথ কুশারীর উত্তোরাধিকারী বলেও দাবী করে ছিলেন। পিঠাভোগ জগন্নাথ কুশারীর অধস্তন ঠাকুর পরিবারের রবীন্দ্রানাথ ঠাকুর কেবল আরকোন বংশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়। রবীন্দ্রনাথ বাঙালীর পরিচিতি আর তার পূর্ব পুরুষের স্মৃতিবাড়ী পিঠাভোগ কুশারী বাড়ীও বাঙালীর ঐতিহ্যের পিটভূমি-অবচেতন মানুষের মুখোমুখি দাড়িয়ে এ কথা স্বীকার করতেই হবে। তবে এই অভিমান এবং অনীহার পেছনে আছে ওই পিরালী পরিচিতি। যা ওদের একটানা সাড়ে চার’শ বছর প্রায় এক ঘরে করে রেখেছিল। এই অভিশপ্ত পরিচিতি ওদের বাধ্য করেছে পিরালী অধ্যষিত খুলনা জেলার মধ্যে সমুদয় আত্মীয়তাকে সীমাবদ্ধ রাখতে।

অভিজাত এবং শিক্ষিত হওয়া স্বত্ত্বেও এই খুলনা জেলার অজপাড়াগায়ের ছয় থেকে দশ বছরের দিগশ্বরী মাতঙ্গিনী আর ভবতারিনীদের সঙ্গে অসাধারন সব গুনী সন্তানদের বিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। নিজেদের বাড়ীর ত্রিশ পয়ত্রিশ টাকা মাইনের কর্মচারীদের মেয়েদের বাড়ীর বধু হিসেবে বরন করা ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিল না।

হেঁশেলের সন্দেশ বাসী না পঁচা, তার পরীক্ষক সামান্য মাইনের জগমোহনের আট বছরের নাতনীর সঙ্গে জোতিন্দ্র নাথের বিয়ের সমন্ধ হলে তীব্র আপত্তি জানিয়ে ছিলেন মেজদাদা ভারতের প্রথম আইসিএস সত্যেন্দ্রনাথ। উত্তরে পিতা মহর্ষি জানিয়েছিলেন উপায় নেই। একে পিরালী, তাই ব্রাহ্ম। কে মেয়ে দেবে ? এখন দেখা যাক, এই পিরালী সম্বন্ধের উদ্ভব হয়েছিল কিভাবে-

যশোর-খুলনার ইতিহাস প্রনেতা সতীশচন্দ্র মিত্রের মতে নবদ্বীপের কাছে পিরালিয়া গ্রামের নাম থেকে পিরালি শব্দের উদ্ভব।

যে ব্যক্তি হিন্দুদের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করতেন তার নামের সঙ্গে গ্রামের নাম যুক্ত হয়। লোকটির আসল নাম ছিল গোবিন্দলাল রায়। সুন্দরী এক মুসলিম রমনীকে বিয়ে করে ধর্মান্তরিত হয়ে নাম হয় পির আলী মহম্মদ তাহের । ধর্মান্তরিত এই মানুষটির কাজই ছিল ব্রাহ্মন, কায়স্থ ও বৈদ্যদের ধর্মনাশ করা। উনি জৌনপুরের শাসক খান জাহান কে চতুর্দশ শতাব্দীর একবারের শেষে পথ দেখিয়ে যশোরের বার বাজারে নিয়ে আসেন। খ্যাতনামা এই ইসলাম ধর্মের প্রচারক বাগেরহাটে স্থিতু হবার আগে তার স্তাবক তাহের আলী কে কসবা,পয়ো গ্রামের শাসনভার দিয়ে যান।

তাহের আলীর দরবারে দক্ষিন ডিহির জমিদারের দুই পুত্র কামদেব এবং জয়দেবের অমাত্য ছিলেন। এই দুই জনই তাহেরের ধর্মান্তর অভিযানের লক্ষ্য ছিলেন। এই সময় একটি ঘটনা ঘটলে তাহের ক্রোধে উন্মাদ হয়ে ওঠেন। রমজান মাসে রোজার সময় এক ব্যক্তির দেওয়া একটি লেবুর গন্ধ নেওয়ার সময় কামদেব ও জয়দেব পরিহাস করে মনে করিয়ে দেন ঘ্রানে যেহেতু অর্ধভোজন হয় সেহেতু তার রোজা ভেঙ্গে গেল।

তাহের এক সময় ব্রাহ্মন ছিলেন বলে এই সিদ্ধান্ত তাকে মানতেই হল। এই অপমানের বদলা নিতে তিনি দরবারে সভা ডেকে জয়দেব ও কামদেব সহ অনেক হিন্দুকে নিমন্ত্রন করলেন এবং পর্দার আড়ালে ব্যবস্থা করা হলো শত শত বকরি আর গো মাংস রন্ধন। বলা বাহুল্য দরবারে প্রবেশমাত্র মুখে কাপড় চাপা দিয়ে সবাই পালাতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু ততক্ষনে ঘ্রানে অর্ধভোজন হয়ে গেছে। সুযোগ হাতছাড়া করেননি তাহের

দুই জনে ধরি পীর খাওয়াইল গোস্ত

পিরালী হইল তারা জাতি ভ্রষ্ঠ।

এই ঘটনা কামদেব, জয়দেব কে পিরালী মুসলমান করে দিল এবং তাদের অন্য দুই ভাই সুকদেব, রতিদেবকে পিরালি ব্রাহ্মন পরিচিতি দিল। রতিদেব বিয়ে করেলেন না। কিন্তু কন্যা বা দৌহিত্রীকে নিয়ে শুকদেব এদেশের প্রথম পিরালী ব্রাহ্মন হয়ে এক ঘরে হয়ে রইলেন। কন্যার বিবাহ যখন অসম্ভব হয়ে দেখা দিল, সেই সময় এক রাতে কলকাতা থেকে পিঠাভোগে যাওয়ার প্রাক্কালে ভৈরব নদীতে ঝড়ে আক্রান্ত হয়ে আশ্রয় সন্ধানে সিদ্ধ শান্ডিল্য গৌত্রীয় জগন্নাথ কুশারী পিরালী ব্রাহ্মন শুকদেবের বাড়ীতে আশ্রয় গ্রহন করলেন এবং অজ্ঞাত কোন কারনে তার কন্যাকে বিয়ে করলেন। সুকদেবের কন্যাকে বিয়ে করার দায়ে পিঠাভোগের কুশারী পরিবার পিরালী দায়গ্রস্থ হলেন।

জগন্নাথ কুশারীর ৬ষ্ঠ পুরুষ মহেশ্বর কুশারীর পুত্র পঞ্চানন ও প্রিয়নাথ। পঞ্চানন কুশারী পিঠাভোগ ত্যাগ করে কলিকাতার গোবিন্দ পুরে ষ্টিমার কোম্পানীতে ঠিকাদারের ব্যবসা শুরু করেন। জাহাজের শ্রমিকরা নবাগত ব্রাহ্মনকে ঠাকুর বলে সম্বোধন করতেন। সেই ঠাকুর পদবী গ্রহন করে বিপুল সম্পদ আর অভিজাত্য লাভ করেন। কিন্তু পিঠাভোগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও ঐ পিরালী কলঙ্ক থেকে মুক্ত হতে পারলেন না। ঐ কলঙ্কের মুকুট মাথায় নিয়ে জোড়া সাকোর ঠাকুর পরিবার বঙ্গ সংস্কৃতির সম্রাট হলেন। অন্য দিকে মহাকাল পিঠাভোগকে বিস্কৃতির অন্ধকারে বিলুপ্ত করে দিল।

সাড়ে চার’শ বছর পরে অবশেষে বাংলাদেশ সরকার প্রায় শিলাইদহর মতো মর্যাদা দিয়ে পিঠাভোগকে সম্মানে নিয়ে আসতে চলেছেন। এই মুহুর্তে কুশারীরা পিরালীর দেওয়াল ভেঙ্গে যে রবীন্দ্রনাথকে বরন করতে চলেছেন, তিনি কুশারী বা পিরালীর কেই নন। তিনি একজন কবি। কেবলই কবি এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

কবিগুরু রবীন্দ্রানাথ ঠাকুরের পিতৃপুরুষের আদি ভিটা রূপসার পিঠাভোগ

বাংলা সাহিত্যের প্রবাদ পুরুষ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি তথা বাঙালী জাতীকে বিশ্বের কাছে উন্নীত করেই ক্ষান্ত হননি তিনি বস্ত্তত বাঙালী জাতী সত্তার প্রান পুরুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিতকরেছেন তার বহুদা বিস্তৃত প্রতিভায়। স্বাভাবিক কবিবরীন্দ্রনাথের পাশাপাশি ব্যক্তি মানুষ রবীন্দ্র নাথ কে সহজ সত্যে ধারন করতে হয়েছে তার পূর্ব পুরুষের উত্তরাধিকারকে। এই বংশজাত উত্তরাধিকারের ঐতিহাসিক ধারায় অবিচ্ছেদ্যভাবে, ভৌগলিক সীমার আবর্তে তিনি আবর্তিত না হয়েও, ভৌগলিক অবস্থানের ঐতিহাসিক পরিচয়কে অস্বিকার করতে পারেননি। আর তাই খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার ৫ নং ঘাটভোগ ইউনিয়নের অধীন পিঠাভোগ গ্রাম রবীন্দ্রনাথের পিতৃকূলের ইতিহাসের সাথে অবিচ্ছিন্ন ভাবে জড়িত। রবীন্দ্রনাথের জীবন এবং বংশগত ধারা আলোচনা করতে গেলে এই পিঠাভোগ প্রাম এসে দাড়াই অপরিহার্য ভাবেযাকে অস্বিকার করার কোন যৌক্তিক হেতু নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তথা ঠাকুর বংশের পূর্বপুরুষ পিঠাভোগ গ্রামের কুশারী বংশের বিচ্ছিন্ন একটি লতিকা ঠাকুর বংশের পূর্বপুরুষ---এ সত্য ঐতিহাসিক ভাবে বিস্তৃত।

খুলনা জেলা রূপসা উপজেলার ৫ নং ঘাটভোগ ইউনিয়নের পিঠাভোগ এবং ঘাটভোগ ভৈরব তীরবর্তী একটি প্রাচীন জনপদ।ভৈরব অববাহিকার শ্রোতধারা ধরে যে সব জনপদ গড়ে তার অন্যতম প্রাচীন জনপদ পিঠাভোগ-ঘাটভোগ। ইতিহাস সাক্ষীদেয় হযরত খানজাহান আলীর আগমনের প্রায় দুই শতাব্দী আগেই এখানে জনপদ গড়ে ওঠে। পিঠাভোগের আদি গোত্রীয় ব্রাক্ষণ বাসিন্দা কুশারী গোষ্ঠীপতি বংশ।

কুশারী বংশের উৎপত্তিঃ

কুশারী বংশের ইতিহাস ও বেশ বিস্তৃত। খ্রিষ্টীয় অষ্টম থেকে একাদশ শতকের মধ্যে আদিশুরের রাজত্ব কালে কান্য কুঞ্জ থেকে পাঁচ জন ব্রাক্ষণ বঙ্গ দেশে আসেন। জলবেষ্টিত বঙ্গ দেশে যখন হিন্দু ধর্মের প্রাধান্য ক্রমশঃ সংকুচিত হয়ে বৌদ্ধ প্রভাবাচ্ছন্ন হতে শুরু করল,তখন বৌদ্ধ প্রভাবাচ্ছন্ন বঙ্গ দেশে হিন্দু ধর্মের বিস্তার করা ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। এই পঞ্চ ব্রাক্ষণ এর মধ্যে শান্ডিল্য গোত্রীয় ক্ষিতিশ ছিলেন অন্যতম। ক্ষিতিশের পুত্র ভট্টনারায়ন বঙ্গদেশে স্থিতিত হয়।ভট্ট নারায়নের পুত্র দীননাথ শান্ডিল্য গোত্রীয় সিদ্ধশ্রোত্রীয় ব্রাক্ষণ মহারাজ ক্ষিকিশুরের অনুগ্রহে বর্ধমান জেলার ’কুশ’’ নামক গ্রামের অধিকার পেয়ে কুশারী গোত্রভূক্ত হন। সেখান থেকে কুশারী বংশের উৎপত্তি ঘটে। খ্রিষ্টিয় চর্তুদশ শতকে কুশারী বংশের ভিন্ন ভিন্ন শাখা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা বাকুড়া এবং তৎকালীন যশোর পরবর্তী খুলনায় কুশারী বংশীয়দের বাসভূমি গড়ে ওঠে। খুলনার পিঠাভোগ ভৈরব তীরবর্তী উত্তর পার্শ্বে রাম গোপাল কুশারী বসতী স্থাপন করেন। রাম গোপালের পুত্র জগন্নাথ কুশারী কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতৃকূলের আদি পুরুষ।

পিরালী জাতের উৎপত্তিঃ

খুলনা জেলার দক্ষিন ডিহির রায় চৌধুরী বংশ পিরালী ব্রাক্ষণ হিসেবে সমাজে পতিত। পঞ্চদশ শতকে দক্ষিন ডিহিতে বসবাস করতে কণকদন্ডী, গুড় গাঞিভূক্ত রায় চৌধুরী ব্রাক্ষন গণ। কন্যকুঞ্জ থেকে আগত দক্ষের বংশধর এই রাঢ়ী ব্রাক্ষণদের উত্তর পুরুষ জ্ঞানানন্দ রায় চৌধুরীরর তনয় জয় কৃষ্ণের পুত্র নাগর নাথ ও দক্ষিনা নাথ ঐ দক্ষিনডিহির বাসিন্দা ছিলেন। (বঙ্গদেশে পঞ্চ ব্রাক্ষণের আগমনের প্রায় দুই শতাব্দি পরে) হযরত খান জাহান আলী বঙ্গদেশ তথা বাংলাদেশে আসেন। তিনি পয়ো গ্রাম কসবা জয়করে তার সহচর মোহাম্মদ তাহির কে সে অঞ্চলের শাসক নিয়োগ করেন। এই তাহিরের আনুকূল্যে দক্ষিনানাথের দুই পুত্র কামদেব ও জয় দেব তার কর্মাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। কথিত আছে একদা রোজার সময় মোহাম্মদ তাহির কে এক প্রজা একটি কলম্বা লেবু উপহার দিলে তিনি তার গন্ধ নিতে থাকেন। তখন কামদেব ও জয়দেব তাকে বললেন হিন্দুশাস্ত্রে আছে গ্রানে অর্ধেক ভোজন বিধায় তার রোজা নষ্ট হয়ে গেছে। মোহাম্মদ তাহির এর প্রতিশোধ নিতে একদিন আমত্যবর্গকে প্রাসাদে নিমন্ত্রন করেন। তার পাশেই (প্রতিশোধের জন্য) মাংস রান্না হচ্ছিল। কামদেব জয়দেব নাকে কাপড় দিয়ে বসে ছিলেন। প্রশাসক মোহাম্মদ তাহির তাদের নাকে কাপড় কেন জিজ্ঞাসা করায়, তারা উত্ত দেন মাংস রান্নার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। মোহাম্মদ তাহির সুবর্ন সুযোগ পেয়ে তাদের জনান ঐ মাংস গো- মাংস অতএব তার গন্ধে অর্ধেক ভোজন হয়ে গেছে। সুতরাং তাদের জাত গেছে। কামদেব ও জয়দেব দুই ভাই জাতিচ্যুত হয়ে মুসলমান ধর্ম পরিগ্রহ করেন।এর ফলশ্রতিতে ভ্রাতৃ সংশ্রব জনিত কারনে রতিদেব ও সুকদেব রায় চৌধুরী পিরালী ব্রাক্ষণ হয়ে সমাজে পতিত হন। এখান থেকেই পিরালী জাতের উৎপত্তি। আর এই পিরালী বংশে ঘটনাক্রমে পিঠাভোগের বিত্তশালী জগন্নাথ কুশারী বিবাহ করেন।

কুশারী থেকে ঠাকুরঃ

জগন্নাথ কুশারীর পরবর্তী পঞ্চম পুরুষ পঞ্চানন কুশারী জ্ঞাতী কলহের কারনে পিঠাভোগের যাবতীয় স্থাবর/ অস্থাবর সম্পত্তি ভ্রাতার অনুকূলে হস্তান্তর করে ভাগীরথী নদীর তীরবর্তী কলকাতা সুতানুটীর দক্ষিন দিকের গ্রাম গোবিন্দ পুরে গিয়ে বসবাস করেন। কথিত আছে সে সময় গোবিন্দপুরে বসবাস করত জেলে, মালো, কৈবর্ত্য, পোদ, বণিক প্রভৃতি জাতী। মজার ব্যাপার এই তথাকথিত এত গুলি জল অনাচরনীয় শুদ্রের মধ্যে পঞ্চানন রাই এক ঘর ব্রাক্ষণ ছিলেন। ফলে এতদ অঞ্চলের লোকজন পঞ্চানন কুশারী কে ভক্তিভরে ’ঠাকুর’’ বলেডাকতেঅভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। কেবল তাই নয় এসময়ে ভাগীরথি নদীতে ইংরেজদেরবানিজ্য তরী ভিড়ত। সেই বানিজ্য তরীর মাল উঠানো-নামানোর টিকাদারী এবং খাদ্য সামগ্রী সরবরাহের ব্যবসা শুরু করেন পঞ্চানন কুশারী। এ কাজে স্থানীয় লোকদের শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ করা হত। এই শ্রমিকেরা তাকে ঠাকুর বলে ডাকায়,জাহাজে কর্মরত কর্মচারী ও কাপ্তানদের কাছেও তিনি ঠাকুর বলে পরিচিত হন। এই ভাবে একদিন পঞ্চানন কুশারীর নাম ও উপাধী ’ঠাকুর’’ ডাকের অন্তরালে অস্তমিত হয় এবং কাগজে- কলমেও ’ঠাকুর’’ উপাধি জারি হয়ে যায়। কলকাতার গোবিন্দ পুরের বাসিন্দা পঞ্চানন কুশারী ওরফে পঞ্চানন ঠাকুরের পরবর্তী বংশধর নীলমনি ঠাকুর কলকাতার জোড়াসাঁাকোয় গিয়ে বাড়ী করেন। জোড়াসাঁকোর এই বিখ্যাত ঠাকুর বংশে ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে জন্ম গ্রহন করেন বাংলা সাহিত্যের প্রবাদ পুরুষ, উজ্জ্বল নক্ষত্র, প্রথম বাঙালী নোবেল বিজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

আত্মীয়তাঃ

রবীন্দ্রনাথের ২২ বছর বয়সে বিবাহ হয় দক্ষিনডিহি গ্রামের বেনীমাধব রায় চৌধুরীর কন্যা ভবতারিনী্ওরফে মৃনালীনি দেবীর সাথে। পিতৃকূল-মাতৃকূল এবং শ্বশুরকূলের সুবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার ৫ নং ঘাটভোগ ইউনিয়নের পিঠাভোগ গ্রামের কুশারী বাড়ী এবং ফুলতলা উপজেলার দক্ষিনডিহি রায় চৌধুরী বাড়ী অঙ্গাঙ্গীন ভাবে জড়িত। স্থানীয় ভাবে শোনা যায় বরীন্দ্রনাথের বিবাহ উপলক্ষে তার পরিবারের সদস্যরা পিঠাবোগের কুশারী বাড়ী অবস্থান করে,অত্র অঞ্চলে মেয়ে দেখাশোনা করেন কিন্তু পিতৃপুরুষ কুশারী বংশের ভিটা পিঠাভোগে আসেননি কোনদিন। অমিতাব চৌধুরী রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থ থেকে সূত্র খুজে পাওয়া যায়। তিনি খুলনাতে একটি মামলার সাক্ষী দিতে এসেছিলেন ১৯৩০খ্রিষ্টাব্দে। সে সময় তার সাথে যে চাকর ছিল তার নাম উমাচরণ। উমাচরণ কে দিয়ে তিনি খোজ নিয়েছিলেন খুলনা থেকে পিঠাভোগের দূরত্ব কত? এবং কিভাবে পিঠাভোগে যাওয়া যায়। তবে পিঠাভোগে তিনি গিয়েছিলেন বা যেতে পেরেছিলেন এমন কোন তথ্য যানা যায় না। এসূত্রে প্রতীয়মান হয় রবীন্দ্রনাথ একদা যেমন নিজেকে পরিচিত করেছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুরের নাতি বলে তেমনিহয়ত সংগোপনে নিজেকে পিঠাভোগ গ্রামের জগন্নাথ কুশারীর উত্তরাধিকারী বলেও দাবী করেছিলেন। সুতরাং রবীন্দ্রনাথের সাথে পিঠাভোগ গ্রামেরকুশারী বাড়ীর সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন বা অহেতুক বলে উড়িয়ে দেয়া যায় নি এবং ভবিষ্যতে উড়য়ে দেয়া যাবেনা।

১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার বানী নাট্য সংস্থা কুশারী পরিবার নামে একটি নাটক মঞ্চস্থ করে। সে নাটকে পিঠাভোগের কুশারী পরিবারের সমাজপতন, পিরালী শাখাভূক্ত হওয়া এবং তৎপরবর্তী কাহিনী উপস্তাপন করা হয়। এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত ভাবে জানা না গেলেও ঐ নাটক মঞ্চায়নের একটি আমন্ত্রন পত্র তার সাক্ষ্য বহন করে।

কুশারী বংশের বিভাজনঃ

জগন্নাথ কুশারীর পরবর্তী ৪র্থ পুরুষ মহেশ্বর কুশারীর দুই পুত্র পঞ্চানন ও প্রিয়নাথ কুশারী। পঞ্চানন কুশারীর স্ব-গ্রাম পিঠাভোগ ত্যাগ করে চলে যান কলকাতার গোবিন্দপুরে। দ্বিতীয় পুত্র প্রিয়নাথ কুশারী পিঠাভোগের বাড়ীতে বিষয়াদী দেখাশুনা করতে থাকেন। তৎপরবর্তীতে এই পরিবারেও খ্যাতিমান ব্যক্তিদের আগমন ঘটে। প্রিয়নাথ কুশারীর ৬ষ্ঠ পুরুষ রামচরণ কুশারীর ৩য় পুত্র তারিনীকান্ত কুশারী প্রচুর ধন সম্পদের মালিক হন। তিনি ইষ্টইন্ডিয়া শিপিং কর্পোরেশনের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর পদে চাকুরীর সুবাদে আলাইপুর পোষ্ট অফিস স্থাপন করেন। রূপসা টু বাগেরহাট রেলওয়ে কোম্পানীর শেয়ার কিনে দুই আনা অংশের মালিক হন। আলাইপুর থেকে ইষ্টিমার ঘাট পিঠাভোগে স্থাপন করেন। পরবর্তী কালে কুশারী পরিবারে বংশবৃদ্ধিজনিত কারনে বিভাজন বাড়তে বাড়তে এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলা মোকদ্দমার ফলে দারিদ্রতা এসে গ্রাস করে।

পিঠাভোগ পুনরুদ্ধারঃ

বৃটিশ আমল থেকে পিঠাভোগ কুশারী বাড়ী নিয়ে কবি সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ ও লেখকদের কৌতুহলের শেষ ছিলনা। তখনকার সময়েস্থানটি উদ্ধারের তৎপরতা চললেও, ঐ বংশের খ্যাতিমান লোকদের অসহযোগীতার কারনে সম্ভবপর হয়নি। পাকিস্থান আমলেও অনুরুপ চেষ্টা সাহিত্যিক ও ইতিহাসবিদদের মধ্যে শুধুমাত্র সীমাবদ্ধ ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও পুনরুদ্ধারের জন্য বিভিন্ন সময় গুনীব্যক্তিদের পদচারনা থাকলেও খুব একটা অগ্রসর হয়নি। ফলে বিশ্ব কবির আদি পুরুষের ভিটা খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার ৫ নং ঘাটভোগ ইউনিয়নের কুশারী বাড়ীর প্রকৃত পরিচয় খানিকটা লোক চক্ষুর আড়ালে থাকলেও ১৯৯৫ সালে তৎকালীন খুলনা জেলা প্রশাসকের আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং রূপসা উপজেলাপ্রশাসনের সক্রিয় সহযোগীতায় ঐতিহাসিক স্মৃতিময় স্থানটি পুনরুদ্ধার হয়। জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন সহ স্থানীয় সাহিত্য প্রেমীএবং সুধীজনের পৃষ্ঠপোশকতায় পিঠাভোগের কুশারী বাড়ীতে রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রশালা স্থাপিত হয়।

এ কাজে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেন তৎকালীন খুলনার জেলাপ্রশাসক, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিমনা জনাব কাজী রিয়াজুল হক, রূপসা থানার নির্বাহী অফিসার পি,বি রায়, সহকারী কমিশনার (ভূমি), ডাঃ বিকর্ন কুমার ঘোষ। সাথে ছিলেন খুলনা ও রূপসা এলাকার কবি, লেখক, শিল্পি সাহিত্যিক সহ সর্বস্তরের সাহিত্য প্রেমী মানুষ।

পিঠাভোগের জগন্নাথ কুশারীর অধ:স্তন ঠাকুর পরিবারের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেবল আর কোন বংশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়- রবীন্দ্রনাথ বাঙালীর পরিচিতি, আর তার পূর্ব পুরুষের স্মৃতিবাহী পিঠাভোগে কুশারী বাড়ীও বাঙালীর ঐতিহ্যের পীঠভূমি অবচেতন মানসের মুখোমুখি দাড়িয়ে একথা স্বীকার করতেই হবে।

রূপসার পাড়ে খান জাহান আলী সেতু:

রূপচাঁদ সাহার কাটা খালটি আজ বিশাল রূপসা নদী। যা দেখে জীবনানন্দ দাশ মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন ‘‘রূপসার ঘোলা জলে হয়তো কিশোর এক সাদা ছেড়া পালে ডিঙ্গা বায়; রাঙা মেঘ সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে ’’ সেই রূপসা নদীর ওপর একটি সেতু হয়েছে লোকে বলে রূপসা সেতু।

পোশাকি নাম খানজাহান আলী সেতু। সেতুর পশ্চিম প্রান্তে নদীর পাড়ে নগরজীবনে হাঁপিয়ে ওঠা মানুষ ভিড় জমায় প্রতিদিন। বিশেষ করে শুক্রবার জায়গাটি হয়ে ওঠে মানুষের মিলনমেলা।

রূপসা নদীর তীরে ৭ বীর শ্রেষ্ঠর মধ্যে অন্যতম রুহুল আমিন:

১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা যশোর সেনানিবাস দখলের পর ১০ ডিসেম্বর দুপুর ১২ টার দিকে পাকিস্তানী নৌ-ঘাটি বি,এন,এস তিতুমীর দখলের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের পদ্মা, পলাশ, এবং ভারতীয় মিত্রবাহিনীর গানবোট ‘‘পানভেল’’ খুলনার শিপইয়ার্ডের কাছে এলে পাকিস্তানী জঙ্গী বিমান গুলোকে দেখা যায় আকাশে। তখন বাংলাদেশীরা শত্রু পক্ষ মনে করে গুলি করার জন্য মুক্তিযোদ্ধারা কমান্ডারের কাছে অনুমতি চায়। পাকিস্তানী বিমান মনে করে অভিযানের সর্বাধিনায়ক ক্যাপ্টেন মনেন্দ্রনাথ গুলি করতে থাকে এবং পদ্মা এর ইঞ্জিন রুমে আঘাত করে ইঞ্জিন বিধ্বস্ত করে। অনেক নাবিক হতাহত হয় । লে. কমান্ডার রায় চৌধুরী নাবিকদের জাহাজ ত্যাগের নির্দেশ দেন। এই বিষয়ে রুহুল আমিন ক্ষুদ্ধ হয় এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাবার নির্দেশ দেন। রুহুল আমিন নির্দেশ দিয়ে ইঞ্জিন রুমের দিকে আসে। অপর দিকে কমান্ডারের কথা অমান্য করতে পারে নাই। কিছুক্ষনের মধ্যে পাকিস্তানের বিমানগুলো উপুর্যপুরি বোমাবর্ষন করে পলাশের ইঞ্জিনরুম ধ্বংস করে দেয়। রুহুল আমিন কোন মতে রূপসা নদীতে ঝাপিয়ে পড়ে। অনেক কষ্ট করে পাড়ে উঠে আসেন। কিন্তু পাকিস্তানের দুসর রাজাকারের দলেরা এই মহান মুক্তিযোদ্ধাকে বেনয়েট দিয়ে খুটিয়ে হত্যা করে। তার মৃত দেহ বেশ কিছুদিন পড়ে থাকে। মুক্তি যুদ্ধে অবদানের জন্য মুক্তিযুদ্ধের সর্বচ্চো খেতাব বীরশ্রেষ্ট উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

বাংলা কাব্যের ঐতিহ্য ও কবি আবুল হোসেন

বাংলা সাহিত্যের অন্যন্য প্রতিভাধর কবি রুপসী রূপসার উজ্জল নক্ষত্র আধুনিকতার প্রথম উদগত্যে কবি আবুল হোসেন খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার কৃতি সন্তান। রূপসা উপজেলার দেয়াড়া গ্রামে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তার জন্ম ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে। পিতা এস এম ইসমাইল হোসেন, চাকুরী করতেন পাকিস্তান পুলিশে। তিন ভাইয়ের ভিতর কবি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। কবির মধ্যম ভ্রাতা এস এম আমজাদ হোসেন পাকিস্তানের শিক্ষা মন্ত্রী ছিলেন। এস এম আশরাফ হোসেন তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা। কবির দুই পুত্র সেলিম হোসেন (সিজার) ও সেহেল হোসেন (মিশা)। চানিদা ও সুনিদা কবির দুই কন্যা।

আবুল হোসেন চল্লিশের দশকের কবি। চল্লিশের দশক বাংলা কবিতার ক্ষেত্রে খুব-ই গুরুত্বপূর্ন সময়। নিয়ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের ইতিহাসে চল্লিশের দশকে ঘটে গেছে হৃদয়ে আঁচড় কাটা অনেক ঘটনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মনন্তর, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। তাই এই চল্লিশের দশক থেকে শুরু হয় পাকিস্তানের শাসক নামধারী শোষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম। ইতিহাস, সময়, সমকাল, অর্থনীতি, প্রেম, প্রপন্নতা, বিশ্বত্মোবোধের চেতনালোকে জেগে ওঠে কবি আবুল হোসেন। কুঠারাঘাত করতে সক্ষম হন বাংলা গদ্য কবিতায়। নিয়ে আসেন আধুনিকতার ছাপ।

যৌবনে পদার্পনের প্রথম পর্বে আঠারোতম জন্ম বার্ষিক বছরে ১৯৪০ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ “নব বসন্ত”প্রকাশিত হয় । এর পর দীর্ঘায়ু স্বনিষ্ঠ আত্মপ্রত্যয়ী কবি সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে নিয়ে এসেছেন সোনার জিয়নকাঠি। তার পরশে ঘুম ভাঙ্গিয়েছেন বাংলা কাব্য রাজকন্যার। একের পর এক লিখেছেন “বিরস সংলাপ”- ১৯৬৯, “হাওয়া তোমার কি দু:সাহস”-১৯৮২, “এখনো সময় আছে”-১৯৯৭, “আর কিসের অপেক্ষায়”-২০০০, “রাজ কাহিনী”-২০০৪, “ব্যঙ্গ কবিতা”-২০০৭, “কালের খাতায়”-২০০৮ প্রভৃতি কাব্য।

সাহিত্যে অবদান রাখার জন্য তিনি ১৯৬৩ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৮০ সালে একুশে পদক পান। এছাড়া তিনি জাতীয় কবিতা পুরস্কার নাসিরুদ্দীন স্বর্ণপদক, পদাবলী পুরস্কার, কাজী মাহবুবুল্লাহ পুরস্কার ও স্বর্ণপদক, আবুল হাসানাৎ সাহিত্য পুরস্কার, জনবার্তা স্বর্ণপদক, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার, জনকন্ঠ গুণীজন সম্মাননা ও জাতীয় জাদুঘর কর্তৃক সংবর্ধনাসহ বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন।

বাংলা কাব্য সাহিত্যের অগ্রদুত কবি আবুল হোসেন ২৯ জুন ২০১৪ সালে ঢাকায় মৃত্যু বরণ করেন।

ভাষা সৈনিক ও শিক্ষাবিদ মালিক আতাহার উদ্দিন

ভাষা সৈনিক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মালিক আতাহার উদ্দিন ১৯৩৪ সালের ৫ এপ্রিল তার প্রৈত্রিক নিবাস রূপসা উপজেলার বাধল গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। পিতা দানবীর হাজী আফতাব উদ্দিন মল্লিক এবং মাতা সবুরণনেছা।

১৯৪৯ সালে সেন্ট জোসেফস্ উচ্চ বিদ্যালয় হতে মেট্রিকুলেশন পাস করে ব্রজলাল কলেজে ভর্তি হন। ১৯৫১ সালে আই.এ পাস করেন এবং ১৯৫৩ সালে বি.এ পাস করেন।অত:পর ১৯৫৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এল.এল.বি ডিগ্রী লাভ করেন এবং ১৯৬০ সালে বাংলা ভাষা সাহিত্যে এম.এ পাস করেন।

ছাত্র জীবন থেকেই ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হন। বি.এল কলেজে ছাত্রাবস্থায় ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য হন। সম্মিলিত বিরুদ্ধ পার্টিগুলোর সাথে কোমর বেধে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেন। এতে তিনি কাঙ্খিত ফল লাভ করেন। ১৯৫৩ সালে বিএল কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে মালিক আতাহার উদ্দিন সাধারণ সম্পাদক (জি.এস) এবং ছাত্রলীগ থেকে বটিয়াঘাটা নিবাসী মো: আব্দুল ওহাব ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। মালিক আতাহার উদ্দিন ছিলেন খুলনা জেলার ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তিনি বিএল কলেজে অধ্যয়ন কালে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে অংশ গ্রহন এবং শহীদ হাদিস পার্কে জনসভায় “রাষ্ট্রভাষা বাংলা” নামে একটি প্রবন্ধ রচনা পাঠ করেন। বক্তৃতার মাধ্যমে জনগণকে মাতৃভাষার গুরুত্ব উপলদ্ধির জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। ১৯৫৪ সালে বিএল কলেজের অভ্যন্তরে (বর্তমান শহীদ মিনার স্থল) কাঠের তক্তা দ্বারা শহীদ মিনার নির্মান করা হয়। উক্ত শহীদ মিনার নির্মাণে সর্বাগ্নে ছিলেন মালিক আতাহার উদ্দিন, গোয়ালখালী নিবাসী খন্দকার জিয়া উদ্দিন আহমদ, কাশীপুরের মোল্যা বজলুর রহমান (১৯৫৫-তে জি.এস নির্বাচিত), বর্তমান খুলনার প্রবীন আইনজীবী মিজানুর রহীম। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইউব খানের শাসনামলে ১৯৫৮ সালে উক্ত শহীদ মিনারটি ভেঙে ফেলা হয়। এরপর তিনি খুলনায় আইন ব্যবসায় নিয়োজিত হন। পাশাপাশি চলে রাজনীতি এরপর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির খুলনা শাখার সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন এবং মাওলানা ভাসানীর আদর্শে উদ্ধুদ্ধ হন। ১৯৬২ –র আগষ্টে তিনি প্রথম কারারুদ্ধ হন এবং কয়েকদিন পর কারামুক্ত হন। এরপর তিনি বহুবার কারারুদ্ধ ও কারামুক্ত হন। তিনি ১৯৬৯ এ গণআন্দোলনে অংশগ্রহন করেন এবং একই বছরে আইন ব্যবসা ত্যাগ করে দৌলতপুর দিবা/নৈশা কলেজে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক নিয়োজিত হন। উক্ত কলেজে তিনি ০৫/০৩/১৯৭৩ থেকে ২২/০৬/১৯৮১ পর্যন্ত অধ্যক্ষের পদ অলংকৃত করেন এবং ০১/০৮/১৯৮৩ থেকে ৩০/১২/১৯৯৪ পর্যন্ত বেলফুলিয়াধীন বঙ্গবন্ধু কলেজের অধ্যক্ষের পদে নিয়োজিত ছিলেন। ২৮/০৫/১৯৯৯ তারিখে তিনি খুলনার নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল কলেন।

তিনি একজন একনিষ্ঠ কর্মী ও আদর্শব্যক্তিত্ব ছিলেন। শিশুদের উন্নয়ন ও বিকাশে খুলনা শিশু একাডেমির কর্মকান্ডে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন। ন্যায় নীতি প্রতিষ্ঠায় আপোষহীন। সোহরাওয়ার্দী কলেজে পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হিসেবে বিধি মোতাবেক কাজের আদর্শ স্থাপন করেন। তিনি অত্যন্ত বিনয়ী, মিষ্টভাষী, মিশুক এবং প্রশাসনিক কাজে কঠোর ছিলেন। জীবনের শেষ প্রান্তে নিজ গ্রামে পিতার দানকৃত জমির উপর নির্মিত জে.বি.এম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের তিনিই প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

স্ত্রী সৈয়দা মহসিনা সানম বি.এ, বি.এড বর্তমানে আমেরিকাতে অবস্থানরত। পুত্র মালিক ইসমাইল আল আজহারী কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আমেরিকাতে কর্মরত আছে। কন্যা মালিহা মালিক এম.কম অনার্স গৃহিনী। ছোট কন্যা মাহফুজা মালিক মুনমুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বর্তমানে আমেরিকাতে পিএইচডি রত। ভ্রাতা মালিক শাহবুদ্দিন বাংলাদেশ রোবার্স মাষ্টার্স। ভ্রাতা মালিক শামছুদ্দিন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ভ্রাতা মালিক জিয়া উদ্দিন ব্যবসায়ী। ভ্রাতা মালিক সরোয়ার উদ্দিন সাংস্কৃতিক সম্পাদক, খুলনা জেলা আওয়ামীলীগ ও প্রতিষ্ঠাতা আহবায়ক বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবকলীগ, খুলনা জেলা শাখা।

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন